— কাইয়ুম চৌধুরী —
সীতাকুণ্ড প্রেসক্লাবের সদস্য ও চট্টগ্রামের একটি আঞ্চলিক পত্রিকার সাংবাদিক মীর মামুন গিয়েছিলেন এক রোগীকে নিয়ে একে খান এলাকায় অবস্থিত আল আমিন হাসপাতালে। যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই গুরুতর আহত অবস্থায় একটি কিশোরকে সেখানে নিয়ে আসা হয়। তখন নিজের রোগীর খোঁজ নেওয়ার চেয়ে কিশোরটির চিকিৎসার তদারকিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি—যেন এটিও তাঁর দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে!
সাধারণত যেকোনো রোগী অচেতন অবস্থায় এলে শুরুতেই ইসিজি করতে হয়। চিকিৎসকেরা ইসিজি করলেন, কিন্তু ইমার্জেন্সির ডাক্তাররা কিশোরটিকে মৃত ঘোষণা করে দায়িত্ব শেষ করলেন। একজন সাংবাদিকের মন খারাপ হওয়াটাই স্বাভাবিক, ছেলেটির জন্য কিছুই করা গেল না!
তবে এরপরের দায়িত্বগুলোও এড়ানো গেল না—ছেলেটির পরিচয় কী, তার মা-বাবা কে, কোথায় তার ঠিকানা? স্বজনদের খবর দিতে হবে এবং মা-বাবার হাতে তার নিথর দেহ হস্তান্তর করতে হবে।
জানা গেল, বড়পুল নয়াবাজার এলাকায় একটি কাভার্ডভ্যান তাকে চাপা দেয়। স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে আল আমিন হাসপাতালে নিয়ে এলেও কেউ তার পরিচয় জানতেন না। সবশেষে নয়াবাজার এলাকায় প্রচারের মাধ্যমে মা-বাবাকে খুঁজে এনে তাঁদের হাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া ছেলের লাশ তুলে দেওয়া হয়।
এত কিছু করতে গিয়ে নিজের রোগীকে সিটে রাখা হলেও কী চিকিৎসা হলো—তার খবর নেওয়ার সময় পাননি সাংবাদিক মীর মামুন। পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি এটিই হলো প্রকৃত মানবিকতা।
ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত আমার সমবয়সী জ্যাঠাতো ভাইয়ের স্ত্রীকে (ভাবি) নিয়ে বিকেল ৫টার দিকে নগরীর একে খান এলাকায় অবস্থিত আল আমিন হাসপাতালে আসি। ইমারজেন্সিতে ডিউটিরত ডাক্তার তাঁর প্রাথমিক চিকিৎসার দেখভাল করছিলেন।
এমন সময়, প্রায় ১৫ মিনিট পর ইমারজেন্সি রুমে সিএনজি অটোরিকশায় করে মারাত্মক দুর্ঘটনায় আহত এক মুমূর্ষু রোগীকে নিয়ে আসা হয়। আমি নিজে ধরে তাঁকে সিএনজি থেকে নামালাম।
ডাক্তার তাঁর হার্টবিট পরীক্ষা করেন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য ইসিজি করান। ইসিজি রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর ডাক্তার তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।)
ছেলেটি আমার সম্পূর্ণ অপরিচিত, তবুও চোখের সামনে তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর সংবাদ শুনে নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি।
ছেলেটির নাম আয়মান। বয়স মাত্র ১৪ বছর। স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত সে। দুই বোনের একমাত্র ভাই, আর তাঁর বাবা একজন কুয়েত প্রবাসী। তাঁদের নিজ বাড়ি সন্দ্বীপ হলেও পরিবারটি থাকত গ্রীনভিউ আবাসিক এলাকায়।
খবরের সূত্রে জানা যায়, বিকেল সাড়ে চারটার দিকে নয়াবাজার গ্রীনভিউ এলাকায় বাইসাইকেল চালিয়ে যাওয়ার সময় বেপরোয়া গতির একটি কাভার্ডভ্যান আয়মানকে সজোরে ধাক্কা দেয়।
স্থানীয় দুজন ভাই তাঁকে উদ্ধার করে নিকটস্থ আল আমিন হাসপাতালে নিয়ে আসেন। তবে কোনো চিকিৎসা শুরু করার আগেই চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
ততক্ষণ পর্যন্ত নিহত ছেলেটির পরিবারের কেউই জানতেন না যে তাঁদের আদরের সন্তান আর বেঁচে নেই। পরে হাসপাতালে নিয়ে আসা সেই দুজন ভাইয়ের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য নিয়ে আয়মানের পরিবারে খবর দেওয়া হয়।
আমরাও হাসপাতালে অপেক্ষা করছিলাম তাঁর স্বজনদের জন্য। নিহত ছেলেটি আমার কেউ ছিল না, তবুও কেন জানি বারবার তাকে নিজের পরিবারের একজন বলেই মনে হচ্ছিল।
সন্ধ্যা ৫টা ৩০ মিনিটের দিকে হাসপাতালে এসে পৌঁছায় আয়মানের পরিবার। হাসপাতালে এসে তাঁর মা এবং দুই বোনের যে আকাশভাঙা কান্না! তাঁদের সেই হৃদয়বিদারক আহাজারি দেখে বহির্বিভাগে থাকা চেনা-অচেনা সবার চোখই অশ্রুসজল হয়ে ওঠে।
যে তরতাজা ছেলেটি বিকেল চারটার সময় মায়ের কোল থেকে হাসিমুখে বের হলো, ঘণ্টার ব্যবধানে সেই ছেলেই মায়ের কোলে ফিরল নিথর লাশ হয়ে!
সন্ধ্যা ৬টার দিকে সেই একই অ্যাম্বুলেন্সে মায়ের সঙ্গে বাড়ি ফিরল আদরের সন্তানের নিথর দেহ।
আমি নিজে রোগী নিয়ে এসেছিলাম ঠিকই, কিন্তু পুরোটা সময় ব্যস্ত ছিলাম নিহত আয়মানকে নিয়ে। হাসপাতাল থেকে তাঁকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটিকে বিদায় দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটা মুহূর্ত নজর রেখে বিদায় জানিয়েছি।
আহা! মৃত্যু… কত সহজ এই মৃত্যু! এ দেশে জন্ম নেওয়াটা দোষের কিছু না হলেও বেঁচে থাকাটাই যেন এক অভিশাপ। এই অভিশাপের কারণেই হয়তো মায়ের কোলে বেড়ে ওঠা সন্তানরা বেশি দিন বেঁচে থাকার হায়াত পায় না।
খুব যত্ন করে গড়ে তোলা মায়ের স্বপ্ন যখন অকালে ঝরে পড়ে, তখন শুধু মায়ের স্বপ্নই শেষ হয় না—ঝরে যায় তাঁর অস্তিত্বের এক বিশাল অংশও। মুহূর্তের মধ্যেই ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়া সেই মায়ের জন্য বাকি জীবন বেঁচে থাকাটাই যেন এক বিষাদময় যন্ত্রণার।
এই লেখা শেষ করা পর্যন্ত সময় রাত ৯টা ১০ মিনিট। হাসপাতালে নিজের রোগীর দেখভালের পাশাপাশি মনটা এখনো পড়ে আছে অকালে ঝরে যাওয়া সেই ভাইটির কাছে।
জন্মের ক্রম আমাদের জানা থাকলেও মৃত্যুর ক্রমটি সম্পূর্ণ অজানা। আমরা যারা এখনো মহান আল্লাহর অশেষ কৃপায় বেঁচে আছি, কেউ জানি না কার ডাক কখন আর কোথায় আসবে…
মাত্র ১৪ বছর বয়স, এখনো কোনো গুনাহ করার বয়সও হয়নি আয়মানের। হয়তো আজ রাতেই তাঁর দাফন সম্পন্ন হবে, পৌঁছে যাবে আখিরাতের চিরন্তন সফরে।
পরম দয়ালু মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তোমাকে ক্ষমা করুন, তোমাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান হিসেবে কবুল করুন। তোমার পরিবারকে এই গভীর শোক সহ্য করার তৌফিক দান করুন এবং আমাদের সবাইকে হেদায়েত ও ক্ষমা দান করুন। আমীন।
সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী ইউনিয়নের ইমামনগর বায়তুশ শরফ জামে মসজিদের বিতর্কিত কমিটি…
কাইয়ুম চৌধুরী, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম): চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (আইআইইউসি) ইংরেজি বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী মাইশা…
কাইয়ুম চৌধুরী, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম): লায়ন্স ক্লাব অব চট্টগ্রাম লিবার্টি এবং ডিজেবিলিটি কেয়ার ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে…
কাইয়ুম চৌধুরী, সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে লরি ও বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চিটাগাংয়ের…
নিজস্ব প্রতিবেদক, সীতাকুণ্ড: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড প্রেসক্লাবের ক্রীড়া, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক এবং দৈনিক আজাদীর সীতাকুণ্ড…
নিজস্ব প্রতিবেদক, সীতাকুণ্ড: জাতীয় রক্তদাতা দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড সিকিউরিটির সামনে বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক…
This website uses cookies.