
আদালতের রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের হরতাল, ধর্মঘট বা অবরোধ কর্মসূচি আহ্বান করাকে সম্পূর্ণ অবৈধ ও সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করে ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট।
রোববার বিচারপতি শশাঙ্ক কুমার সরকার ও বিচারপতি ফয়সাল হাসান আরিফের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় প্রদান করেন। রায়ে আদালত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, আদালতের রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার আইনগত সুযোগ ও নির্দিষ্ট ফোরাম সবসময় খোলা রয়েছে, কিন্তু রায়ের ক্ষোভে বা প্রতিবাদে রাজপথে ধর্মঘট বা পরিবহন অবরোধের ডাক দেওয়া কোনোভাবেই বৈধ হতে পারে না।
আইনগত ভিত্তি ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা
রায়ে সংবিধানের ১১২ অনুচ্ছেদের ওপর বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে। উক্ত অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বাংলাদেশের সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের সহায়তা ও নির্দেশ পালনে বাধ্য। হাইকোর্ট বলেন, আদালতের রায় বা আদেশ দেশের সকল নাগরিক ও কর্তৃপক্ষের জন্য বাধ্যতামূলক। এর বিরুদ্ধে কর্মসূচি দিয়ে বিচার বিভাগের ওপর চাপ সৃষ্টি করা সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থী।
দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ ও ফৌজদারি ব্যবস্থা
ভবিষ্যতে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ধর্মঘট বা হরতাল আহ্বান করা হলে সংশ্লিষ্ট বাস মালিক সমিতি এবং শ্রমিক সংগঠনের বিরুদ্ধে কঠোর ফৌজদারি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য স্বরাষ্ট্র সচিব, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) এবং বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনকে (বিআরটিসি) সুনির্দিষ্টভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
মামলার পটভূমি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
২০১১ সালের আগস্ট মাসে মানিকগঞ্জের ঘিওরে মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ, বিশিষ্ট গণমাধ্যমব্যক্তিত্ব মিশুক মনিরসহ পাঁচজন নিহত হন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত অভিযুক্ত বাসচালককে কারাদণ্ড প্রদান করেন।
আদালতের এই রায়ের প্রতিবাদে বাসমালিক ও শ্রমিক সংগঠনসমূহ তাৎক্ষণিকভাবে পরিবহন ধর্মঘট ও হরতাল পালন করে, যা জনজীবনকে চরম মাত্রায় বিপর্যস্ত করে তোলে। রায়ের প্রতিবাদে এই ধরনের কর্মসূচি চলাচলের মৌলিক অধিকারকে ক্ষুণ্ন করায় মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’ (HRPB)-এর পক্ষে জনস্বার্থে একটি রিট পিটিশন দায়ের করা হয়।
উক্ত রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০১৭ সালে হাইকোর্ট রুল জারি করেছিলেন। রুলে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ধর্মঘট বা হরতাল আহ্বান কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ধর্মঘট প্রত্যাহার এবং স্বাভাবিক যানবাহন চলাচল নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ওই অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশের পরই পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছিল। দীর্ঘ শুনানি শেষে আজ রুল যথাযথ ঘোষণা করে চূড়ান্ত রায় দিলেন হাইকোর্ট।
আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ, সঙ্গে ছিলেন অ্যাডভোকেট সঞ্জয় মন্ডল ও অ্যাডভোকেট রিপন বাড়ৈ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আহসান হাবীব। বিআরটিসির পক্ষে অ্যাডভোকেট আসিবুল হক এবং বিআরটিএর পক্ষে অ্যাডভোকেট মো. রাফিউল ইসলাম শুনানিতে অংশ নেন।
রায় পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় আইনজীবী মনজিল মোরসেদ গণমাধ্যমকে জানান, আদালতের রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে ধর্মঘট ডেকে মালিকপক্ষ মূলত বিচার বিভাগের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছিল। এই ধরনের কর্মসূচির কারণে সাধারণ নাগরিকদের চলাচলের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয় এবং হাজার হাজার সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হন। এই রায়ের ফলে বিচার বিভাগের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকার পাশাপাশি জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী এ ধরনের অযৌক্তিক কর্মসূচি আইনিভাবে প্রতিরোধ করা সহজ হবে।
WWW.DESHENEWS24.COM/REGISTRATION NO-52472/2024
Leave a Reply