
কাইয়ুম চৌধুরী,সীতাকুণ্ডঃ
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ ধামে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের তিন দিনের শিবচতুর্দশী মেলা গত শনিবার থেকে শুরু হলেও আজ রবিবার থেকে মূল মেলা শুরু হয়েছে। আজ রবিবার সন্ধ্যা ৫ টা ১৮ মিনিটে
শিবরাত্রি হবে সোমবার সন্ধ্যায় ৬ টা ২ মিনিটে শেষ হবেন।
এই শিবরাত্রি উপলক্ষে প্রতিবছর ফাল্গুন মাসের শিব চতুর্দশী তিথিতে সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ ধামে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তীর্থ করতে আসেন।
মেলার প্রথম দিন ত্রয়োদশীতে তারা সংযম পালন করে থাকে। চতুর্দশী তিথিতে ব্রত রেখে স্নান তর্পণ করেন। এরপর সীতাকুণ্ডের মঠ মন্দির পরিক্রমা করে স্বয়ম্ভুনাথ মন্দির এবং চন্দ্রনাথ মন্দিরের শিবের মাথায় জল,ও দুধ ঢেলে থাকেন পূর্ণার্থীরা। তৃতীয় দিন অমাবস্যা তিথিতে মৃত পূর্ব পুরুষের আত্মার সন্তুষ্টির জন্য শ্রাদ্ধ করে থাকেন।
এবারের মেলা শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একদিন পর। নির্বাচন পূর্ব এবং পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন হবে এমন উদ্বেগের কারণে মেলায় তীর্থযাত্রী কম হওয়ার আশঙ্কা করছে আয়োজকরা। মেলার সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন থাকলেও প্রথম দিনে তীর্থযাত্রী একেবারে নেই বললেই চলে।
তবে সীতাকুণ্ড স্রাইন কমিটি ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিতের কথা বলা হয়েছে। ইতিমধ্যে পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর সদস্যরা তীর্থধাম এলাকায় পরিদর্শন করেছেন।
সীতাকুণ্ড স্রাইন কমিটির সহকারী ব্যবস্থাপক তুষার চক্রবর্তীর আমাদের সময় কে জানান, প্রতিবছর এই দিনে তীর্থযাত্রীদের পদচারণায় মুখরিত হতো সীতাকুণ্ড ধাম। এ বছর নির্বাচনকালীন সময় থাকায় এখনো তীর্থযাত্রী তেমন দেখা যাচ্ছে না।
সীতাকুণ্ডস স্রাইন কমিটির সাধারণ সম্পাদক চন্দন দাশ আমাদের সময় কে জানান, মেলায় তীর্থযাত্রী আসবে এটাই স্বাভাবিক ধরে নিয়ে তারা মেলার সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। প্রতিবছরের মতো তীর্থযাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে একাধিকবার সভা করেছেন। ইতিমধ্যে তারা বিভিন্ন মঠ মন্দিরের সংস্কার এবং চন্দ্রনাথ মন্দিরে ওঠার পথে সংস্কারের কাজ শেষ করেছেন। তীর্থের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে চন্দ্রনাথ ধাম। এছাড়া মহেশখালীর আদিনাথ ধামেও ব্যাপক সংস্কার করা হয়েছে। তীর্থযাত্রীদের যাতায়াতে যাতে কোনো অসুবিধা না হয় সে ব্যবস্থা করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও মেলা কমিটির নির্বাহী সভাপতি মোঃ ফখরুল ইসলাম আমাদের সময় কে জানান, সীতাকুণ্ড স্রাইন কমিটি মেলার ধর্মীয় আয়োজন সম্পন্ন করেছে। নিরাপত্তার বিষয়ে পুলিশ এবং সেনাবাহিনী ব্যবস্থা নিয়েছে। এবারের মেলা নিরাপদ হবে এমন আশা করছেন তিনি।
শিব চতুর্দশী মেলা উপলক্ষে যেসব ট্রেন সীতাকুণ্ড স্টেশনে থামছে
প্রতিবারের মতো এবারও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ শিবচতুর্দশী মেলা উপলক্ষে সীতাকুণ্ডে স্টেশনে তীর্থ যাত্রী যাতায়াতে ট্রেন থামানোর বিশেষ ব্যবস্থা করেছে।
সীতাকুণ্ড রেলস্টেশন মাস্টার নিজাম উদ্দিন আমাদের সময় কে জানান, যে সকল ট্রেন সীতাকুণ্ড স্টেশনের থামছে তার মধ্যে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা মহানগর এক্সপ্রেস, বিজয় এক্সপ্রেস, মেঘনা এক্সপ্রেস ও বিজয় এক্সপ্রেস এবং সিলেট থেকে ছেড়ে আসা পাহাড়ীকা ও উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেন। এছাড়া ঢাকা-মুখী ঢাকা মেইল ও মেঘনা এক্সপ্রেস ট্রেন থামছে সীতাকুণ্ড।
তীর্থ করতে আসা সনাতন ধর্মালম্বী হারাধন নন্দী মাষ্টার আমাদের সময় কে জানায়,
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় এক হাজার ২০০ফুট উপরে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চুড়ায় থাকা চন্দ্রনাথধাম পরিক্রমা করায় তীর্থযাত্রীদের মূল লক্ষ্য। প্রতিবছর শিবচতুর্দশীতে এ মন্দির পরিক্রমায় কষ্টের আঁকাবাঁকা পাহাড়িপথ পাড়ি দিয়ে চন্দ্রনাথ ধামে উঠে পূর্ণ্যার্থীরা। মেলায় চতুর্দশী তিথিতে ব্যাসকুণ্ডে স্নান-তর্পন, গয়াকুণ্ডে পিণ্ডদান করে তীর্থ যাত্রীরা। এখানে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে রয়েছে বিরুপাক্ষ মন্দির, স্বয়ম্ভুনাথ মন্দির, সতীর একান্ন পীঠের একটি শক্তিপীঠ ভবানী মন্দির, সীতা মন্দির, হনুমান মন্দির। সমতলে রয়েছে ব্যসকুণ্ড ও ভৈরব মন্দির। এছাড়া শঙ্কর মঠ ও মিশন, ভোলানন্দ গিরি সেবাশ্রম, রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম ও সৎসঙ্গসহ সব মিলিয়ে অর্ধশত মঠ মন্দির রয়েছে। ধর্মীয় এ মেলাকে ঘিরে বসে তৈজসপত্র,পাঠ্যপুস্তুক, খাবারের দোকান, খেলনা, আসবাবপত্রসহ নানা পন্যের দোকান। মেলায় আগত পূর্ণ্যার্থীরা ধর্মীয় আচার শেষ করে কেনাকাটা করে বাড়ি ফেরেন।
প্রতিবছর চতুর্দশীতে লাখো তীর্থযাত্রী চন্দ্রনাথ ধামের তীর্থ করতে এলেও অনেকেই জানেন না কিভাবে তীর্থ শুরু করতে হয়। এ তীর্থের ফলই বা কি? এর সঙ্গে বাড়তি কি কি ধর্মীয় আচার পালন করে মৃত পূর্বপুরষদের আত্মার সন্তুষ্টি করা যায় তা অনেকে জানেন না।
ভোলানন্দগিরি সেবাশ্রমের অধ্যক্ষ স্বামী উমেশানন্দ গিরি জানান, শিবরাত্রিতে শিবচতুর্দর্শী ব্রত রেখে ভক্তকূলকে শুরুতে আত্মাশুদ্ধ ও দেহ সুচী করে পাপমুক্ত করতে হবে। এজন্য প্রত্যেক পূণ্যার্থীকে শুরুতেই ব্যসকুণ্ডে স্নান করতে হবে। এতে ইহজাগতিক পাপকার্য সমাপ্ত হয়। স্নানাদী সেরে দ্বারপাল ভগবান মহাকাল ভৈরবজীকে দর্শন করে তীর্থ শুরুর অনুমতি নিতে হয়। এরপরই পূর্ণীর তীর্থের শুরু হয়ে গেল। এরপর পদব্রজে রওনা দিয়ে শুরুতে ভগবান রামচন্দ্রের মন্দির, মা সীতার মন্দির ও মহাবীর হনুমানজীর মন্দিরে গিয়ে দর্শন ও প্রার্থনা করা হয়। এরপর সতীপীঠ দেবী ভবানী মন্দির দর্শন ও পরিক্রমা করতে হয়। পরিক্রমা শ্রী স্বয়ম্ভুনাথজীর মন্দিরে অর্চনাদি করতে হয়। এরপর কিছু সময় সেখানে অপেক্ষা করে ভগবানকে স্বরণ করতে হয়। এরপর দেবী অন্নপূর্ণা, ভগবান নারায়ণ, ও কর্পন্দেশ্বর মহাদেব দর্শন করতে হয়।
স্বামী উমেশানন্দ গিরি জানান, ওঁ নম শিবায় জপ করতে করতে পদযাত্রা শুরু করে ভগবান চন্দ্রশেখর শ্রী চন্দ্রনাথ ধামের দিকে যাত্রা শুরু করতে হয়। পথিমধ্যে বিরুপাক্ষজীকে দর্শন ও অর্চনা করতে হয়। সর্বশেষ চন্দ্রশেখর শ্রী চন্দ্রনাথ ধামে গিয়ে দেবাদিদেব মহাদেবের ভক্তি অর্ঘ্য প্রদান শেষে ভক্ত তার মানত মোক্ষ প্রাপ্তির জন্য নিজেকে মনো সংকল্প করতে হয়। এভাবে চন্দ্রনাথ তীর্থ সম্পন্ন হয়।
কিন্তু এর পরেও ভক্তদের তীর্থ সম্পূর্ণরুপে পরিপূর্ণতা পেতে হলে বাড়বকুণ্ডের বাড়বানল অগ্নিকুণ্ডে স্নান ও বারৈয়ারঢালা ইউনিয়নের লবনাক্ষ মন্দিরের সূর্যকুণ্ডে স্নান শেষ হলেই পরিপূর্ণ তীর্থ হয়।
স্বামী উমেশানন্দ গিরি আমাদের সময় কে জানান, মূলত ভক্তরা তাদের পাপ মোচন করে মোক্ষ প্রাপ্তির জন্য এই তীর্থ পালন করেন।
এছাড়া ব্যাসকুণ্ডের জল অতি পবিত্র। এই জলে নিজে স্নান করলে নিজের পাপ তো দূর হয়। এছাড়া পূর্বপুরুষের আত্মার শুদ্ধির জন্য তর্পণ করা হয়। আমাবশ্যায় পূর্বপুরুষের জন্য গয়াকুণ্ডে পিণ্ডদান করে থাকেন।
সনাতন ধর্ম শাস্ত্র মতে কোন মানুষের মৃত্যুর পর তার আত্মার প্রেতশুদ্ধি করতে হয়। তাই মৃত পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তির জন্য প্রত্যেক সনাতনী ভক্তের তর্পন ও শ্রাদ্ধা করা কর্তব্য। এতেই মৃত মাতৃকূল ও পিতৃকুলের পূর্বপুরুষদের আত্মা শুদ্ধি হয়। এজন্য শিবচতুর্দশী তিথিতে ব্যাসকুণ্ডে তর্পন ও গয়াকুণ্ডে পিণ্ডদান করতে হয়।
সীতাকুণ্ড স্রাইন(তীর্থ) কমিটির সহকারী ব্যবস্থাপক তুষার চক্রবর্তী আমাদের সময়কে জানায়, শিবচতুর্দশী তিথি শুরু হবে আজ রোববার বিকেল ৫টা ১৮ মিনিট পর, সেটি ছেড়ে যাবে সোমবার সন্ধ্যা ছয়টা ২ মিনিট ৩৮ সেকেন্ড পর। এরপর আমাবস্যা
শুরু, আগামী ১ মার্চ’২৬ দোল পূর্ণীমা পুজা ও মেলা সমপন্ন হবে বলে মেলা আয়োজকরা জানায়।
WWW.DESHENEWS24.COM/REGISTRATION NO-52472/2024
Leave a Reply