মাতৃভাষার জন্য বাংলাদেশ সহ অনেক রাষ্ট্রই আন্দোলন করতে হয়েছে

কাইয়ুম চৌধুরীঃ

মাতৃভাষার জন্য কম বেশী অনেক রাষ্ট্রেই আন্দোলন করতে হয়েছে।কোথাও জীবন দিতে হয়েছে কোথাও নানান কর্মসূচি পারন করে বাস্তবায়ন করেছে।

ভাষার জন্য দুনিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনটা করছিলো তামিলরা।
১৯৩৭ সালে শুরু হওয়া এ আন্দোলন ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত চলতে থাকে। ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ পর্যন্ত সময়ে প্রায় দুই হাজার নারী-পুরুষ কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয় এ আন্দোলনের জন্য।
১৯৫৮ সালে নেহেরু মাদ্রাজ সফরে গিয়া তামিলভাষীদের আন্দোলন নিয়া তীর্যক মন্তব্য করলে এক রক্তক্ষয়ী প্রতিবাদে তখন প্রায় ৩০০ মানুষ গুলিবিদ্ধ হয় মাদুরায়।
হিন্দিকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিশাবে চাপিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে চলা এ আন্দোলন চূড়ান্ত রুপ নেয় ১৯৬৬ সালে। তামিলনাড়ুতে তখন আন্দোলনকারীদের উপরে নৃশংস হামলা চালিয়ে দেড় শতাধিক মানুষ হত্যা করা হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ভারতের ততকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর সরকার তামিলদের দাবী মেনে নিতে বাধ্য হয়।

১৯৭৬ সালে ভাষার দাবীতে রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের আরেকটা নির্মম ইতিহাস তৈরী হয় দক্ষিন আফ্রিকার সোয়েটা অঞ্চলে। এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলো স্কুল শিক্ষার্থীরা। ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গদের সরকার তখন দেশটির ক্ষমতায়।
সোয়েটায় আফ্রিকান কালোদের সংখ্যাধিক্য থাকলেও পলিসি মেইকিং-এ তাদের কোনো গুরুত্ব ছিলো না। তাদের মাতৃভাষা ছিল জুলু। লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা ইংরেজিতে শিক্ষা নিত তারা।
কিন্তু ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গরা এ ভাষায় কথা বলত না। তারা কথা বলত জার্মান-ডাচ ভাষার মিশ্রণে ‍উদ্ভুত ইন্দো-ইউরোপীয় একটি ভাষায়। যা পরিচিত ছিলো আফ্রিকানস নামে।
১৯৭৬ সালের জুন মাসে সোয়েটার কালো ছাত্ররা স্কুলে আফ্রিকানস ভাষা বাধ্যতামূলক করার প্রতিবাদে একটি বিরাট প্রতিবাদের আয়োজন করে।
শ্বেতাঙ্গ সরকার ও তার পুলিশ বাহিনীর নির্মম গুলিতে সেদিন প্রায় ২০ জন শিশু নির্মমভাবে শহীদ হয়। আহত হয় আরো প্রায় ২০০ জন।
সোয়েটো থেকে আন্দোলন পার্শ্ববর্তী শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো। ১৯৭৬ সালের এই আন্দোলনে দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ৪৫০ জন মারা যায় এবং প্রায় চার হাজার মানুষ আহত হয়।
এরপর সংগ্রাম ও স্বাধীনতার এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান হয়ে ওঠে সোয়েটা। ধীরে ধীরে এই আন্দোলন বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। এই ঘটনাকে বলা হয় সুয়েটো অভ্যুত্থান।
এছাড়াও আমেরিকা, কানাডা, লাটভিয়া সহ দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে ভাষার জন্য রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের ইতিহাস আছে।

বাংলা ভাষার জন্য বাঙ্গালীরা দুই দেশে দুইবার প্রাণ দিছে। একবার ততকালীন পাকিস্তানে উর্দুর বিরুদ্ধে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে। সেদিন ঢাকায় পুলিশের অতর্কিত গুলিতে পাঁচ জনের অধিক আন্দোলনকারী নির্মমভাবে শহিদ হন।

বাঙ্গালীরা বাঙলার জন্য আরেকবার প্রাণ দেয় ভারতের আসামে ১৯৬১ সালে। অসমীয়াকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রতিবাদে সেখানকার বাঙ্গালীরা ১৯ মে হরতালের ডাক দেয়।

শান্তিপূর্ণ হরতাল পালনকালে শিলচর রেলওয়ে স্টেশনে পুলিশ ১১ জন আন্দোলনকারীকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে।
মহান ভাষা শহীদের প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম জানাই।

Didar

Recent Posts

খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ: নিয়োগে অনিয়ম ও পারিবারিক উত্তরাধিকারের অভিযোগ

 কাইয়ুম চৌধুরী: ​খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদকে ঘিরে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, জেলা পরিষদ…

2 days ago

নাগেশ্বরীতে মায়ের ঘরে আগুন দেওয়ার অভিযোগে ছেলে গ্রেপ্তার

প্রতিনিধি, কুড়িগ্রাম: কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে মাদকের টাকার জন্য বৃদ্ধা মায়ের বসতঘরে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেওয়ার অভিযোগে…

3 days ago

সীতাকুণ্ডের চার ইউনিয়নে ত্রাণ বিতরণ: মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে আছি এবং থাকবো — আসলাম চৌধুরী

কাইয়ুম চৌধুরী, সীতাকুণ্ড | ১৮ জুলাই, ২০২৬ ​সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সীতাকুণ্ড উপজেলার বিভিন্ন…

3 days ago

বালিয়াডাঙ্গীতে পুকূরে ডুবে শিশুর করুণ মৃত্যু।

ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতা: ঠাকূরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় পুকূরের পানিতে ডুবে মোস্তাকিম নামে ৩ বছরের এক শিশুর মর্মান্তিক…

4 days ago

ভূরুঙ্গামারীতে মোটরবাইকের ধাক্কায় নারী নিহত

রংপুর সংবাদদাতা: কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীতে মোটর বাইকের ধাক্কায় রাশেদা খাতুন (৪৫) নামে এক নারী নিহত হয়েছে।…

5 days ago

ঠাকুরগাঁওয়ে বজ্রপাতে বাবা-ছেলের মর্মান্তিক মৃত্যু

ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতাঃ ঠাকুরগাঁও, ১৫ জুলাই: ঠাকুরগাঁওয়ের সদর উপজেলায় বজ্রপাতে আনোয়ার প্রভু (৫৫) ও তার ছেলে…

5 days ago

This website uses cookies.