
কাইয়ুম চৌধুরী, সীতাকুণ্ড:
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে আট বছর বয়সী শিশু জান্নাতুল নাঈম ইরাকে ধর্ষণের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে শ্বাসনালি কেটে হত্যার বহুল আলোচিত মামলায় একমাত্র আসামি বাবু শেখ (৫০)-কে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড, পৃথক ধারায় আরও ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং সর্বমোট ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকেল ৩টায় চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪-এর বিচারক (সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ) জান্নাতুল ফেরদৌস আলেয়া এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি বাবু শেখ আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
রায়ে আদালত দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যার অপরাধে আসামিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড এবং ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন। এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত-২০০৩)-এর ৭ ধারায় যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং একই আইনের ৯(৪)(খ) ধারায় ধর্ষণের চেষ্টার অপরাধে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়। সব মিলিয়ে আদালত আসামির বিরুদ্ধে মোট ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন।
রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আ ন ম কামরুল হাসনাত চৌধুরী। বাদীপক্ষে অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মো. সরোয়ার হোসাইন লাভলু ও অ্যাডভোকেট রিক্তা বড়ুয়া এবং আসামিপক্ষে স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী হিসেবে অ্যাডভোকেট বিবেকানন্দ চৌধুরী যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন।
অ্যাডভোকেট সরোয়ার হোসাইন লাভলু জানান, গত ১ মার্চ সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড় এলাকায় সংঘটিত এ নৃশংস ঘটনার তদন্ত শেষে ১৫ জুন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। ১৮ জুন আদালত অপহরণ, ধর্ষণের চেষ্টা ও হত্যা ধারায় অভিযোগ গঠন করেন। রাষ্ট্রপক্ষ ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্য উপস্থাপন করে। সাক্ষীদের মধ্যে ভিকটিমের মা-বাবা, বড় বোন, চাচা, প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিক, চিকিৎসক ও তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন। গত ৩০ জুন আসামির পরীক্ষা, ১ জুলাই আত্মপক্ষ সমর্থনে সাফাই সাক্ষ্য গ্রহণ এবং ২ জুলাই উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত রায়ের জন্য ৯ জুলাই দিন ধার্য করেছিলেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী আরও বলেন, ঘটনার দিন বাবু শেখ শিশুটিকে ফুসলিয়ে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে। এতে ব্যর্থ হয়ে সঙ্গে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার শ্বাসনালি কেটে ফেলে। এরপর শিশুটিকে মৃত ভেবে সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক ও চন্দ্রনাথ পাহাড়ের মাঝামাঝি একটি পাহাড়ি খাদে ফেলে সে পালিয়ে যায়।
গুরুতর আহত অবস্থায়ও ইরা অলৌকিকভাবে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওপরে উঠে এসে সাহায্যের আকুতি জানায়। পরে সড়ক সংস্কার কাজে নিয়োজিত শ্রমিক ও স্থানীয় এক সিএনজি অটোরিকশা চালক তাকে উদ্ধার করে প্রথমে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইরা তার ওপর সংঘটিত পাশবিক নির্যাতনের বর্ণনা দেয়। মৃত্যুর সঙ্গে টানা দুই দিন লড়াই করে ৩ মার্চ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, ঘটনার দিন বাবু শেখ শিশুটিকে ফুসলিয়ে চন্দ্রনাথ মন্দির সংলগ্ন পাহাড়ে নিয়ে যায়। মন্দিরের সিসিটিভি ফুটেজে শিশুটিকে নিয়ে তার পাহাড়ে ওঠার দৃশ্য রেকর্ড হয়। পরবর্তী সময়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামি ধর্ষণের চেষ্টা ও হত্যার ঘটনা স্বীকার করে। ঘটনার পরদিন কুমিরা ইউনিয়নের ছোট কুমিরা কাজীপাড়া এলাকা থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় নিহত ইরার মা সীতাকুণ্ড থানায় মামলা দায়ের করেন।
রায় ঘোষণার পর নিহত ইরার পরিবারের সদস্যরা সন্তোষ প্রকাশ করেন। রাষ্ট্রপক্ষও এ রায়কে শিশু ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে অভিহিত করেছে।
তদন্ত কর্মকর্তার প্রশংসা
রায় ঘোষণার সময় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই কামরুজ্জামানের পেশাদারিত্ব, দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করা, গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের ভূয়সী প্রশংসা করেন বিচারক। আদালত বলেন, মামলাটি দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে নিষ্পত্তিতে তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিচারক তার নিষ্ঠা, দক্ষতা ও আন্তরিক অবদানের জন্য তাকে ধন্যবাদ জানান এবং বলেন, এমন পেশাদার তদন্তই দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে সহায়ক হয়।
WWW.DESHENEWS24.COM/REGISTRATION NO-52472/2024
Leave a Reply