Categories: জাতীয়

ভূরুঙ্গামারীতে প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও শিক্ষক পেটানোর অভিযোগ: তদন্তে বিভাগীয় উপপরিচালক


ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম):

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার মানিককাজি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মোছাঃ কামরুন্‌নাহার বেগমের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, সরকারি সম্পদ নষ্ট এবং সহকারী শিক্ষকদের ওপর হামলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অনিয়ম ও শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে বিদ্যালয়টিতে চরম অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে গত (২৩ মে ) ২০২৬ শনিবার সকালে রংপুর বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের উপপরিচালক বিদ্যালয়ে গিয়ে সরেজমিন তদন্ত শুরু করেন।


।। অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের পাহাড়।।
রংপুর বিভাগীয় উপপরিচালক বরাবর জমাকৃত অভিযোগপত্র ও সচেতন এলাকাবাসীর সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে এই বিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকেই বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন প্রধান শিক্ষিকা কামরুন্নাহার।


🔸পুকুর লিজের টাকা আত্মসাৎঃ বিদ্যালয়ের মালিকানাধীন পুকুরটি প্রতি বছর ১৫ হাজার টাকায় লিজ দিয়ে সেই অর্থ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে নিজেই আত্মসাৎ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
🔸সরকারি গাছ গায়েবঃ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই বিদ্যালয় মাঠের ২০টি গাছ কাটা হয়েছে। গাছগুলো চুরি হয়েছে বলে প্রধান শিক্ষিকা নিজে স্বীকার করলেও এর পেছনে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে স্থানীয়দের ধারণা।
🔸উপকরণ ক্রয়ে ফাঁকিঃ প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণীর উপকরণ ক্রয়ের জন্য নিয়মিত সরকারি বরাদ্দ আসলেও ২০১৮ সালের পর থেকে বিদ্যালয়ে নতুন কোনো উপকরণ কেনা হয়নি।
🔸সরকারি সম্পদের ব্যক্তিগত ব্যবহার: বিদ্যালয়ের দুটি ল্যাপটপ ও একটি রাউটার দীর্ঘদিন ধরে নিজ বাসায় নিয়ে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করছেন প্রধান শিক্ষিকা।


।। সহকারী শিক্ষকদের ওপর হামলা ও হুমকি।।
অভিযোগে প্রকাশ, প্রধান শিক্ষিকার এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখ খোলায় এবং তদন্তে সাক্ষী দেওয়ায় তিনি সহকারী শিক্ষকদের ওপর চড়াও হন। পূর্বে এক সহকারী শিক্ষিকাকে চড়-থাপ্পড় মারার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া বর্তমান সহকারী শিক্ষক মোঃ আবু বকর ছিদ্দিককে শারীরিকভাবে আক্রমণ করে তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। মাঝেমধ্যেই তিনি বহিরাগত আত্মীয়-স্বজন এনে শিক্ষকদের হুমকি দেন বলে শিক্ষকরা জানান। এমনকি বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী তদন্তে সত্য সাক্ষী দেওয়ায় তাকে শাসানো ও ভয়ভীতি দেখানো হয়। পরবর্তীতে ওই শিক্ষার্থীর অভিভাবক ক্ষিপ্ত হয়ে দলবল নিয়ে এসে পাল্টা হুমকি দিলে বিদ্যালয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কামরুন্নাহার তার পূর্বের কর্মস্থলেও একই রকম উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করতেন।


।।প্রশাসনিক উদাসীনতা ও পরস্পরবিরোধী প্রতিবেদন।। বিদ্যালয়ের এই কোন্দল নিরসনে সাবেক স্কুল ম্যানেজিং কমিটি বারবার চেষ্টা করেও প্রধান শিক্ষিকার হাতে অপমানিত হয়ে ব্যর্থ হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনিকভাবে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার এবং সহকারী শিক্ষা অফিসার এই বিষয়ে পরস্পরবিরোধী তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করেছেন বলে উভয় পক্ষই দাবি করছে।


।। পাল্টা অভিযোগ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল।।
তবে নিজের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রধান শিক্ষিকা কামরুন্‌নাহার বেগম। তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমাকে স্কুল থেকে সরানোর জন্য একটি মহল এসব করছে। এর আগেও দুই বার তদন্ত হয়েছে এবং উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা সেগুলো মিথ্যা প্রমাণ করে নিষ্পত্তি করেছেন।”


এদিকে স্থানীয়দের একাংশের মতে, বিদ্যালয়ের এই কোন্দলের পেছনে সহকারী শিক্ষক মোঃ মজিবর রহমানেরও ভূমিকা রয়েছে। ১৯৮৭ সাল থেকে দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর ধরে একই বিদ্যালয়ে কর্মরত এই শিক্ষক একসময় বিদ্যালয়ের পুকুর এককভাবে ভোগ করতেন। সমালোচনা শুরু হলে তিনি পুকুর ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এছাড়া প্রভাব খাটিয়ে স্কুল চলাকালীন বিদ্যালয়ের মাঠ নিজের ধান ও খড় শুকানোর কাজে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।


।। আতঙ্কে শিক্ষার্থীরা, এলাকাবাসীর ক্ষোভ।।
শিক্ষকদের এই প্রকাশ্য কোন্দল ও মারামারির ঘটনায় চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিদ্যালয়ের শিক্ষা পরিবেশ। অভিভাবকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শিক্ষকদের মারামারি আর কোন্দলের কারণে বাচ্চারা সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকে। কখন কী ঘটে এই ভয়ে অনেকেই স্কুলে আসতে চায় না। শিক্ষকরা সঠিক সময়ে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন না, যার ফলে পড়াশোনায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে”।


।। তদন্ত কমিটির বক্তব্য।।
শনিবার সরেজমিন তদন্তে আসা রংপুর বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তদন্ত দলের প্রধান (উপপরিচালক) সাংবাদিকদের জানান, “অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা তদন্ত শুরু করেছি। তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে এবং সে অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং এই দীর্ঘমেয়াদী কোন্দলের অবসান ঘটিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ও অভিভাবক মহল।

Mohammed Alam

Recent Posts

সীতাকুণ্ডের সলিমপুর জামায়াতের ঈদ পুনর্মিলনী ও কর্মী সমাবেশে জেলা সেক্রেটারী মু: আব্দুল জব্বার

কাইয়ুম চৌধুরী, সীতাকুণ্ডঃ তৃণমূল ও জাতীয় পর্যায়ে সৎ, যোগ্য ও আদর্শিক নেতৃত্বের জন্য দেশবাসী থাকিয়ে…

1 hour ago

কেন্দ্রীয় যুবদলের সহ-সভাপতি হলেন সীতাকুণ্ডের ছেলে মুন্না

দিদার টুটুলঃ সীতাকুণ্ডের কৃতি সন্তান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রনেতা ফেরদৌস আহমেদ মুন্না বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী…

1 day ago

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় আমদামীকৃত স্ক্যাপ জাহাজ ফেরৎ পাঠানোর উদ্যোগ

কাইয়ুম চৌধুরী, সীতাকুণ্ডঃ পুরাতন জাহাজ ব্যবসায়ী শওকত আলী চৌধুরী হংকং থেকে আমদামী করা পুরাতন জাহাজ…

1 day ago

প্রাক্তন শিক্ষার্থী পরিষদের আয়োজনে নলুয়া দ্বিজেন্দ্র লাল কারণ উচ্চ বিদ্যালয়ে স্মরণ সভা ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠান

বিশেষ প্রতিনিধি: চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়াস্থ নলুয়া দ্বিজেন্দ্র লাল কারণ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী পরিষদের উদ্যোগে…

2 days ago

জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগরে পথসভায় জনসাধারণের সাথে মতবিনিময় করলেন পুলিশ সুপার

কাইয়ুম চৌধুরী, সীতাকুণ্ডঃ বুধবার ( ০৩ জুন) সন্ধ্যা ৭ টায় চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড থানাধীন জঙ্গল…

2 days ago

দাকোপে অসহায় পরিবারের ওপর হামলা, পিতা-পুত্র-কন্যা সহ আহত ৪

খুলনা ব্যুরো- খুলনার দাকোপ উপজেলার কৈলাশগঞ্জ ধোপাদী এলাকায় নুর ইসলাম লস্করের নেতৃত্বে একটি অসহায় পরিবারের…

2 days ago

This website uses cookies.