সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে এখনো পঁচা ধান সংগ্রহে কৃষকদের লড়াই, অনেকের পঁচা ধানই সম্বল


জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধিঃ
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে এখনো পঁচা ধান সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক-কৃষাণীরা। বৈশাখ মাস পেরিয়ে জ্যৈষ্ঠ মাসেও পঁচা ধান তুলতে লড়াই করে যাচ্ছেন কৃষকেরা।


বৈশাখের মাঝামাঝি সময়ে টানা অতিভারি বৃষ্টিতে জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওরসহ অন্যন্যা হাওরে উৎপাদিত কিছু অংশের পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান ডুবে যায়। এ সময় টানা বৃষ্টিপাতের কারণে হারভেস্টার মেশিন ডুবে যাওয়া ধান কাটতে নামেনি। মিলেনি পর্যাপ্ত শ্রমিকও। অন্য বছরের মতো এবারো কৃষকেরা হারভেস্টার মেশিনের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আনা হয়নি ধান কাটার শ্রমিক (নাইয়া)। অনেকে নাইয়া আনলেও তা পর্যাপ্ত ছিলো না। এতে বিপাকে পড়ে যান কৃষকেরা।


স্থানীয় শ্রমিক পাওয়া দুস্কর হয়ে পড়ে। মাঝে মধ্যে স্থানীয় শ্রমিক পাওয়া গেলেও তাদের পারিশ্রমিক দৈনিক এক হাজার টাকা করে দিতে হয়েছে। এভাবে কৃষকেরা নিজে ও অল্প শ্রমিক নিয়ে নৌকা অথবা কোমড় ও পেট পানিতে নেমে যতো সম্ভব ধান কর্তন করেছেন। বাকি জমির ধান পানিতে ডুবে যায়। এদিকে-ধান কর্তন করলেও রোদ না থাকায় ধান শুকানো সম্ভব হয়নি। ফলে মাড়াই করা ধান, মুটি বাধা ধান, মুটি ছাড়া কর্তনকৃত ধান যে যেখানেই রেখেছেন সেখানেই অনেক ধান চারা গজিয়ে নষ্ট হয়ে যায়। এতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েন কৃষকেরা। তখন কান্নায় ভেঙে পড়েন কৃষক-কৃষাণীরা। এর মধ্যে কৃষকের সাথে কৃষাণীরাও হাওরে গিয়ে নৌকা দিয়ে ধান কর্তন করে বাড়িতে নিয়ে এসেছেন। এভাবে প্রায় দুই সপ্তাহ প্রতিকূল আবহাওয়ার সঙ্গে সাহসের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন কৃষক-কৃষাণীরা।


অবশেষে বৈশাখের শেষের দিকে রোদের দেখা মিলে। তখন কৃষকেরা ধান শুকাতে গিয়ে দেখতে পান তাদের সংগ্রহকৃত অধিকাংশ ধান চারা গজিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। এ সময় রোদ পাওয়ায় পূর্বে কর্তনকৃত ভালো ধান পরে কর্তনকৃত নষ্ট ধান শুকাতে থাকেন। এর মধ্যে জমিতে ডুবে যাওয়া অনেকের ধান কর্তনের ব্যবস্থা করা হয়। ততক্ষণে ডুবে যাওয়া ধানের গোড়া পচন ধরে নষ্ট হয়ে গেছে। এসব পঁচা ধান এখনো সংগ্রহ করছেন কৃষক-কৃষানীরা। জমি থেকে এসব পঁচা ধান (আকি দিয়ে) নৌকা দিয়ে তুলে আনছেন। এনে রাস্তাঘাটে শুকাতে দিচ্ছেন। এতে অল্প কিছু ধান আসলেও বেশিরভাগ পঁচা খড় আসছে। রোদে শুকিয়ে যা পাওয়া যায়, তাতেই সন্তোষ্ট থাকছেন কৃষকেরা। জগন্নাথপুরে অবাধে রাস্তাঘাটে এসব ধান শুকাতে দেয়ায় চলাচলকারী যানবাহনের সাময়িক অসুবিধা বা দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকলেও কেউ কিছু বলছেন না। উল্টো কৃষকের সুবিধা দিয়ে চলাচল করছেন। এটি হচ্ছে মানবিকতা। এতো কিছুর পর ধান সংগ্রহ করলেও বাজারে দাম নেই। বর্তমানেও ভালো শুকনো ধান প্রতিমণ বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৮শ থেকে ৯শ টাকায়। যা কৃষকের লোকসানের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ফলে খাদ্য গুদামে সরকারিভাবে ১৪৪০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করতে হুমড়ি খেয়ে পড়েন কৃষকেরা। লটারির মাধ্যমে ধান ক্রয় করায় অধিকাংশ কৃষকেরা সরকারি এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।


(১৬ মে) শনিবার সরেজমিনে জগন্নাথপুর উপজেলার রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের গন্ধর্বপুর গ্রামের পাকা রাস্তায় এসব পঁচা ধান রোদে শুকাতে দেখা যায়। এর মধ্যে পুরোপুরি রোদ ছিল না। বৃষ্টিও হয়েছে। তবুও অনেক আশা নিয়ে রাস্তাঘাটে ধান শুকানোর প্রতিযোগিতা চলছে। এর মধ্যে খোরাকি সংগ্রহে পঁচা ধানই অনেকের সম্বল। তাই পঁচা ধান রোদে শুকাতে দিয়ে তারা বারবার নাড়াছাড়া করছেন।


এ সময় গন্ধর্বপুর গ্রামের কৃষক ছইফুল উদ্দিন জানান, তিনি এবার ১০ কেদার বোরো জমি আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে টানা বৃষ্টি উপেক্ষা করে ৮ কেদার জমির ধান কর্তন করলেও বাকি ২ কেদার জমি পানিতে ডুবে যায়। যা এখন নৌকা দিয়ে তুলে এনে শুকাতে দিয়েছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এসব পঁচা ধান থেকে যতোটুকু পাওয়া যায়, এতেই আমরা খুশি। এছাড়া আছলম আলী, এনামুল হক সহ অন্যান্য কৃষকেরাও এভাবে পঁচা ধান সংগ্রহে এখনো যুদ্ধ করছেন। এর মধ্যে অনেক কৃষক রয়েছেন, যারা এখনো খোরাকির ধান তুলতে পারেননি। তাই পঁচা ধান থেকে খোরাকি সংগ্রহের চেষ্টা করে যাচ্ছেন।


হাওর বাঁচাও আন্দোলন জগন্নাথপুর উপজেলা কমিটির সভাপতি উপজেলার চিলাউড়া-হলদিপুর ইউপি চেয়ারম্যান মো.শাহিদুল ইসলাম বকুল জানান, এবার বাঁধ ভেঙে হাওরে ফসলহানি হয়নি। অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা হয়ে হাওরে অনেক কৃষকের ধান তলিয়ে যায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা দিশেহারা হয়ে পড়েন।
জগন্নাথপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাওসার আহমেদ জানান, এবার জগন্নাথপুরে ২০ হাজার ৪২৩ হেক্টর বোরো জমি আবাদ হয়েছিলো।


জলাবদ্ধতায় কিছু অংশের ধান ডুবে যাওয়ায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। বর্তমানে ধান কর্তন প্রায় শেষ হয়ে গেছে। এখনো বিচ্ছিন্নভাবে ডুবে যাওয়া ধান সংগ্রহ করছেন কৃষকেরা। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ধান ডুবে বা চারা গজিয়ে প্রায় ১২শ ১১ একর জমির ধান নষ্ট হয়েছে। এতে প্রায় ১৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। তবে স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা তা মানতে নারাজ। তাদের দাবি আরো অনেক বেশি ক্ষতি হয়েছে।

Mohammed Alam

Recent Posts

১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ উপলক্ষে সীতাকুণ্ডে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়

সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি: গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট…

18 hours ago

সীতাকুণ্ড নাগরিক সমাজের সঙ্গে মতবিনিময়ে অর্থমন্ত্রী খসরু: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজট কমাতে যাত্রাবাড়ী থেকে সিটি গেট পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হবে

কাইয়ুম চৌধুরী, সীতাকুণ্ড: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজট কমাতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে…

18 hours ago

তারেক রহমানের সরকার মানেই সকল ধর্মের জন্য সুশাসন এবং বাংলাদেশীদের জন্য এক অকৃত্রিম ভালোবাসা— আসলাম চৌধুরী

কাইয়ুম চৌধুরী, সীতাকুণ্ড: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ৫২৫৩৩তম আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে আয়োজিত জন্মাষ্টমী উৎসবে…

21 hours ago

চন্দনাইশে ১ কোটি ২৩ লাখ টাকার সড়ক সংস্কারকাজে নিম্নমানের সামগ্রীর অভিযোগ

বিশেষ প্রতিনিধি: চট্টগ্রামের চন্দনাইশে ১ কোটি ২৩ লাখ টাকা ব্যয়ে দোহাজারী-চাগাচর-ভোর বাজার সড়ক সংস্কারকাজে নিম্নমানের…

21 hours ago

সীতাকুণ্ডে তারেক রহমানের কারামুক্তি দিবস ও সন্ত্রাসবিরোধী সংবাদ সম্মেলন

সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি ​চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ১৯তম কারামুক্তি দিবস উপলক্ষে র‍্যালি, পথসভা এবং স্থানীয়…

2 days ago

খুলনার দাকোপে বাজুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মলয় কুমার রায়ের বিদায়ী সংবর্ধনা

খুলনা সংবাদদাতা: ​খুলনার দাকোপ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বাজুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মলয় কুমার রায়ের…

2 days ago

This website uses cookies.