
কাইয়ুম চৌধুরী –
সীতাকুণ্ডে চাঁদার দাবিতে রাস্তার ওপর টিনের বেড়া দিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টির ফলে ১৮ দিন ধরে পাঁচটি ইয়ার্ডের মালামাল কেনাবেচা ও পরিবহন বন্ধ ছিল। অবশেষে এই চাঁদাবাজির অভিযোগে রমজান আলী বলি নামে একজনকে গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তার গ্রেপ্তারের পর এলাকায় কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও, তার সহযোগীদের ভয়ে এখনো আতঙ্কে রয়েছেন ইয়ার্ড মালিক ও ব্যবসায়ীরা।
জানা যায়, সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট থেকে কুমিরা উপকূল পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ১৯৮০ সাল থেকে গড়ে ওঠে জাহাজ ভাঙা শিল্প, যা শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড হিসেবে পরিচিত। এই অঞ্চলে একসময় প্রায় ১৬৫টি ইয়ার্ড থাকলেও বর্তমানে সচল রয়েছে ২৫টির মতো। কিন্তু অবাধ চাঁদাবাজির কারণে এই শিল্প আজ অস্তিত্ব সংকটের মুখে।
বারাকা শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের মালিক আলহাজ্ব সামছুল আলম জানান, স্থানীয় সন্ত্রাসী রমজান আলী বলি ও তার ভাই আরাফাত ইয়ার্ডের প্রবেশপথ আটকে ট্রাক চলাচল বন্ধ করে দেয়। তারা ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিল। এ বিষয়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, শিপ ব্রেকিং অ্যাসোসিয়েশন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে বারবার অভিযোগ করেও দীর্ঘদিন কোনো সুরাহা মেলেনি। সন্ত্রাসীরা গত ২১ ফেব্রুয়ারি ও ১৬ জুন টিনের বেড়া দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছিল। স্থানীয়রা তা ভেঙে ফেললেও, গত ২১ জুন রমজান পুনরায় রাস্তা দখল করে বেড়া দেয়। ফলে বারাকা ও সাগরিকা শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে মালামাল পরিবহন ও বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
থানায় অভিযোগ করেও প্রতিকার না পেয়ে মালিকপক্ষ জেলা পুলিশ সুপারের শরণাপন্ন হয়। পরে বিশেষ গোয়েন্দা টিম গত ৮ জুলাই রাতে নগরীর আন্দরকিল্লা থেকে রমজান আলী বলিকে গ্রেপ্তার করে সীতাকুণ্ড থানায় সোপর্দ করে। এ ঘটনায় রমজান ও তার ভাই আরাফাতের বিরুদ্ধে সীতাকুণ্ড মডেল থানায় ১৪৩/৩৪১/১০৯/৩৮৫/৫০৬ ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, জাহাজ ভাঙা শিল্পের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে শত শত রি-রোলিং মিল এবং নাট-বল্টু, ইলেকট্রিক সামগ্রী, ফার্নিস অয়েল ও গৃহস্থালি পণ্যের বাজার। কিন্তু চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্যে এই শিল্প আজ হুমকির মুখে। কখনো সরাসরি মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি, আবার কখনো স্বল্পমূল্যে মালামাল হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন সন্ত্রাসীরা। দাবি পূরণ না হলে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া ও মালিকদের গাড়িতে হামলার মতো ঘটনাও ঘটছে। অতিসম্প্রতি বিওসি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের মালিক মোঃ মানিকও একই ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন।
আলহাজ্ব সামছুল আলম জানান, তিনি আইনসম্মতভাবে ইয়ার্ডের রাস্তা প্রশস্ত করেছেন এবং সীমানা প্রাচীরের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। রমজান আলী ও তার ভাই আরাফাত অহেতুক ২০ লাখ টাকা দাবি করে আসছিল, পরে তা ১০ লাখে নামিয়ে আনে। সাগরিকা শিপ ইয়ার্ডের মালিক আলহাজ্ব সিরাজুদ্দৌলা জানান, রমজান একসময় মাস্টার আবুল কাসেমের ইয়ার্ডে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিল, কিন্তু বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে চাকরিচ্যুত হওয়ার পর সে চাঁদাবাজিকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়।
গত ৬ জুলাই বাণিজ্যমন্ত্রী সীতাকুণ্ড পরিদর্শনকালে মালিকরা এ বিষয়ে তাকে অবহিত করেন। মন্ত্রী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন।
সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ মাহিনুল ইসলাম জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ সুপারকে অবহিত করা হয় এবং আইনগত প্রক্রিয়া শেষে রমজান আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে পাঠানো হবে এবং তার ভাই আরাফাতকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এতদিন কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি জানান, বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক আলোচনার প্রয়োজন ছিল। তবে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।
WWW.DESHENEWS24.COM/REGISTRATION NO-52472/2024
Leave a Reply