
কাইয়ুম চৌধুরী, সীতাকুণ্ড:
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে সরকারি ১ নং খতিয়ানের পূর্বের রেকর্ডে ৩ লাখ ১০ হাজার শতক (৩১ শত একরের অধিক) খাস পাহাড় ভূমি থাকলেও বর্তমানে উপজেলা ভূমি অফিসের রেকর্ডে মাত্র ১ লাখ ২৫ হাজার ৭৮১ শতক ভূমির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ফলে বাকি ১ লাখ ৮৪ হাজার ২১৯ শতক ভূমির রেকর্ডে কোনো হদিস নেই। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই বিশাল পরিমাণ সরকারি খাস ভূমির রেকর্ড পরিবর্তনের পেছনে তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী শিল্পপতির হাত রয়েছে।
যেভাবে চলতো পাহাড় কাটা ও প্লট বাণিজ্য:
জঙ্গল সলিমপুরের ভূমির তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন নীতি নির্ধারকদের আশীর্বাদপুষ্ট ও অনুগত শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিনের সঙ্গে ভূমি অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ ছিল। তারা সরকারি খাস ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করে ভুয়া ব্যক্তি মালিকানাধীন রেকর্ড তৈরি করেন। এরপর সেখানে পাহাড় কেটে বালু বিক্রি এবং প্লট তৈরি করে ছিন্নমূল মানুষের কাছে নগদে ও মাসিক কিস্তিতে বিক্রি করতেন ইয়াছিন। হাজার হাজার একর সরকারি ভূমি নিজের নামে রেকর্ড করিয়ে তা বিক্রির মাধ্যমে হস্তান্তর করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন এই সন্ত্রাসী।
প্রভাবশালীদের দখলে খাস জমি:
অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তার বাবা মরহুম আখতারুজ্জামান বাবুর নামে সরকারি খাস জমি পরিবর্তন করে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ‘চৌধুরী অ্যাগ্রো’ ও ‘চৌধুরী ডেইরি’সহ একাধিক প্রতিষ্ঠান।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম ব্রিকস অ্যান্ড ক্লে লিমিটেড, খাঁন অ্যাগ্রো, সলিমপুর সিডিএ আবাসিক প্রকল্প, মুক্তিযোদ্ধা বসতি নগর প্রকল্প, জলিল টেক্সটাইল, সীমা রি-রোলিং মিলস লিমিটেডসহ আরও অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের নামেও এই সরকারি খাস জমি পরিবর্তন করে ব্যক্তি মালিকানাধীন নামজারি করে দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের বক্তব্য ও উদ্যোগ:
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমেদ এই প্রতিবেদককে বলেন:
জঙ্গল সলিমপুরের সরকারি খাস ভূমির পূর্বের রেকর্ড অনুযায়ী তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। নিয়মবহির্ভূতভাবে কোনো খাস জমি ব্যক্তি মালিকানায় গিয়ে থাকলে তা দ্রুত বাতিল করে পুনরায় সরকারি খাস খতিয়ানে ফিরিয়ে আনা হবে।
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোঃ সাখাওয়াত জামিল গণমাধ্যমকে বলেন:
সীতাকুণ্ড সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসের রেকর্ডে ৩১ শত একরের স্থলে মাত্র ৯১০ একর খাস ভূমির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, যা সত্যিই ভাবনার বিষয়। এরই মধ্যে জেলা প্রশাসকের কাছে বিভিন্ন সরকারি ও আধাসরকারি সংস্থা জঙ্গল সলিমপুরের ভূমি বরাদ্দের জন্য লিখিত আবেদন জানিয়েছে।
আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে—চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), পুলিশ, র্যাব, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, বিজিএমইএ এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। ২০২২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এসব প্রতিষ্ঠানকে ভূমি বরাদ্দ দেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছিল।
এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে সন্ত্রাসী ইয়াছিন।
এদিকে সন্ত্রাসী ইয়াছিন পর্দার আড়ালে থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে বারবার দাবি করছেন, তিনি সরকারি ভূমি দখল করেননি; বরং নিজের নামের জমি বিক্রি করেছেন। এখনও শত শত একর ভূমি তার নিজের নামে রয়েছে বলে তিনি দাবি করছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখছে প্রশাসন।
এ ব্যাপারে সীতাকুণ্ড সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন:
জঙ্গল সলিমপুরের ভূমির সকল রেকর্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। খাস ভূমি কীভাবে ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড হলো, এর পেছনে কী ধরনের অনিয়ম হয়েছে এবং কারা জড়িত-সবই বের হয়ে আসবে। নিয়মবহির্ভূত ব্যক্তিগত রেকর্ড খতিয়ান অবশ্যই বাতিল করা হবে। আমাদের ভূমি অফিস এ নিয়ে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে সরকারের সব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সেনাবাহিনী জঙ্গল সলিমপুরে রাস্তা নির্মাণের কাজ শুরু করে দিয়েছে।
WWW.DESHENEWS24.COM/REGISTRATION NO-52472/2024
Leave a Reply