
বিশেষ প্রতিনিধি, সিলেট-
সিলেটের তারাপুর চা বাগানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক বিশাল মাদক সাম্রাজ্য। আর এই সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি বা ‘ডন’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন জগন্নাথ রায় নামের এক ব্যক্তি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হরেক প্রজাতির মাদক সংগ্রহ করে তারাপুরের গোপন ডিপোতে স্টক (মজুদ) করেন তিনি। এরপর নিজস্ব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তা সরবরাহ করা হয় পুরো সিলেট জেলায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাদক ব্যবসার আড়ালে জগন্নাথ বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। তার মাদক পরিবহনের বহরে রয়েছে ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা মূল্যের ৩টি নিজস্ব সিএনজি অটোরিকশা এবং একাধিক মোটরসাইকেল। শুধু তাই নয়, প্রায় ৯০ লাখ টাকা বাজেটে স্থানীয় পেশী শক্তি এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের (বিএনপিপন্থী কতিপয় নেতা) ছত্রছায়ায় মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তার মাদক সাম্রাজ্যের বিশাল অবকাঠামো ও নির্মাণকাজ পরিচালনা করছেন তিনি।
‘মাসিক মাসোহারা’ ও প্রশাসনের নীরবতা
স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশ, র্যাব কিংবা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর—যেকোনো সংস্থার অভিযানের আগেই অলৌকিকভাবে খবর পৌঁছে যায় জগন্নাথের কাছে। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের ‘মাসিক অনুদান’ বা মাসোহারা দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নির্ভয়ে এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তারাপুর চা বাগান সংলগ্ন বহিরাগত কিছু ভূমিদস্যু ও সুবিধাভোগী রাজনীতিবিদ নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে এই সিন্ডিকেটে সর্বোচ্চ সেল্টার (আশ্রয়) দিচ্ছেন।
২৪ ঘণ্টার বাজার, সকালেই ভাগ হয় লভ্যাংশ
তারাপুর বাগানের ভেতরে সকাল থেকে রাত অবধি ২৪ ঘণ্টা চলে মাদকের বেচাকেনা। প্রতিদিনের কেনাবেচা শেষে রাতে প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে লভ্যাংশের টাকা চলে যায় নেপথ্যের গডফাদার ও আশ্রয়দাতাদের পকেটে। আর পুরো সিন্ডিকেটের প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে কলকাঠি নাড়েন জগন্নাথ নিজে।
বর্তমানে পুরো সিলেট ভ্যালির চা বাগানগুলো এখন জগন্নাথের একক আধিপত্যে জিম্মি। তারাপুরকে মূল কেন্দ্র বানিয়ে আলী বাহার, লাক্কাতুরা, কালিহাটি, কেওয়াছড়া, দলদলি, খাদিম, গুলনী, বরজান, ললিছড়া এবং পুটিছড়া চা বাগানসহ সর্বত্র বিস্তৃত তার এই মাদকের নেটওয়ার্ক।
যুবসমাজ ধ্বংসের মরণনেশা: ‘মোহিনী গাঁজা’
জগন্নাথের মাদক সাম্রাজ্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং ভয়ঙ্কর হাতিয়ার হলো ‘মোহিনী গাঁজা’। সোনালী রঙের (গোল্ডেন শেড) জটলা বাঁধা এবং তীব্র সুঘ্রাণযুক্ত (গ্রেট পারফিউম) এই বিশেষ গাঁজার একমাত্র আমদানিকারক ও সরবরাহকারী জগন্নাথ। সিলেটের তরুণ প্রজন্ম এই মরণনেশার পেছনে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে।
এই ব্যবসার লভ্যাংশের চিত্র রীতিমতো চোখ কপালে তোলার মতো। বাজারে যেখানে সাধারণ গাঁজা প্রতি কেজি ১৪ হাজার টাকায় কিনে খুচরা পর্যায়ে ৪৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়, সেখানে জগন্নাথের এই বিশেষ ‘মোহিনী গাঁজা’ পাইকারি কিনতে হয় ৩০ হাজার টাকায় এবং তা খুচরা বাজারে বিক্রি হয় রেকর্ড ৭৫ থেকে ৮০ হাজার টাকায়! বাগান ভেতরের গোপন আস্তানা ছাড়াও বাগানের বাইরের প্রধান সড়কগুলোতে মোটরসাইকেলের মাধ্যমে সিন্ডিকেটের সদস্যরা এই গাঁজা ক্রেতাদের হাতে পৌঁছে দেয়।
এই মাদকের মরণকামড় থেকে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী চা বাগানগুলো এবং তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে অনতিবিলম্বে প্রশাসনের শীর্ষ মহলের কঠোর হস্তক্ষেপ ও নিরপেক্ষ অভিযান দাবি করছেন স্থানীয় সচেতন মহল
WWW.DESHENEWS24.COM/REGISTRATION NO-52472/2024
Leave a Reply