
শারদীয় দুর্গোৎসবের ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে সীতাকুণ্ডে শুরু হয়েছে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। এরই মধ্যে পুরো সীতাকুণ্ড জুড়ে বিরাজ করছে ব্যাপক উৎসবের আমেজ। পৌরশহর থেকে শুরু করে গ্রাম ও পাড়া-মহল্লা—সবখানেই এখন আনন্দের ছোঁয়া।
মণ্ডপে মণ্ডপে প্যান্ডেল নির্মাণ ও আলোকসজ্জার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিমা তৈরির কারখানাগুলোতে গত দুই মাস ধরে দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করেছেন মৃৎশিল্পীরা। রং-তুলির শেষ আঁচড়ে পূর্ণতা পেয়েছে দেবী দুর্গাসহ অন্যান্য প্রতিমার অবয়ব।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ ফখরুল ইসলাম জানান, সীতাকুণ্ডে এবার ৭৪টি মঠ-মন্দিরে শারদীয় দুর্গোৎসবের সব ধরণের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।
পূজা আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সীতাকুণ্ড উপজেলায় এবার ৭৪টি মণ্ডপের পাশাপাশি ৫টি স্থানে ঘটপূজার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। অধিকাংশ মণ্ডপেই প্রতিমা স্থাপনের কাজ শেষ। কোথাও গত রাতভর চলেছে শেষ ধাপের রং-তুলির কাজ, আবার কোথাও প্রতিমাকে শাড়ি, গহনা ও অন্যান্য অলংকারে সাজিয়ে তোলার কাজ চলছে।
সীতাকুণ্ড পৌরসদরের বিভিন্ন মণ্ডপ ঘুরে দেখা যায়, সার্বিক পরিবেশ বেশ উৎসবমুখর। মণ্ডপগুলোর নিরাপত্তায় আনসার, পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকরা ক্যাম্প স্থাপন করে দায়িত্ব পালন করছেন। কোথাও শিল্পী দেবীর চোখ আঁকতে ব্যস্ত, আবার কোথাও দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের পোশাক ও অলংকার সাজানো হচ্ছে। একইসঙ্গে প্রতিমা তৈরির কারখানাগুলোতেও বিশেষ নিরাপত্তা নজরদারি রাখা হয়েছে। কারখানাগুলো থেকে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রতিমা মণ্ডপে মণ্ডপে সরবরাহ করা হয়েছে।
পৌরসদরের ‘মা প্রতিমা শিল্পালয়ে’র স্বত্বাধিকারী মৃৎশিল্পী আদিত্য আচার্য জানান, তাঁর কারখানায় এবার ৪০ হাজার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা দামের প্রতিমা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণির ভক্ত ও ক্রেতাদের চাহিদা বিবেচনায় রেখেই প্রতিমার নকশা ও সাজসজ্জা করা হয়েছে। এ বছর তাঁর কারখানা থেকে প্রায় ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকার প্রতিমা বিক্রি হয়েছে বলে তিনি জানান।
অন্য এক মৃৎশিল্পী শ্রাবণ পাল বলেন, “সীতাকুণ্ডের তৈরি প্রতিমার সুনাম দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও রয়েছে। প্রতিমা তৈরিতে সমুদ্রের কাদামাটি, বাঁশ ও খড়সহ নানা উপাদান ব্যবহার করা হয়। অনেক শ্রম ও সাধনার পরই দেবী দুর্গার রূপ ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হয়।”
দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে প্রতিমা তৈরির সঙ্গে সরাসরি জড়িত মৃৎশিল্পীদের জীবিকার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
উপজেলার বিভিন্ন মঠ-মন্দির ও পূজামণ্ডপে প্যান্ডেল নির্মাণ, আলোকসজ্জা ও ডেকোরেশনের কাজ শেষ পর্যায়ে। দর্শনার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচলের কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রবেশপথসহ বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। অনেক মণ্ডপেই নান্দনিক ও ভিন্নধর্মী নকশার মাধ্যমে বিশেষ সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
শারদীয় দুর্গোৎসব নির্বিঘ্ন করতে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মণ্ডপগুলোতে সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সীতাকুণ্ড উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অমলেন্দু কনক বলেন, “উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রতিটি মণ্ডপে নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবকরা দায়িত্ব পালন করছেন।”
তিনি আরও জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির কারণে জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল এলাকায় এবার দুটি দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ ছাড়া সম্প্রীতি বজায় রাখতে প্রতিটি মণ্ডপে আজান ও নামাজের সময় সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র ও সাউন্ড সিস্টেম বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বাবুল বাহাদুর শাস্ত্রী জানান, মণ্ডপের ভেতরে ও বাইরে মাদক সেবনের ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। কেউ নিয়ম ভাঙলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে সীতাকুণ্ড এখন রঙিন আলো ও আনন্দের আমেজে মেতে উঠেছে। নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় ফুটে উঠেছে দেবীর মৃন্ময় রূপ। ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে পূজা উদযাপনে ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
সীতাকুণ্ড পৌরসভা পূজা কমিটির সভাপতি সুজন মল্লিক ও সাধারণ সম্পাদক পাবন কৃষ্ণ দাশ জানান, পৌরসভা ও উপজেলা মিলিয়ে মোট ৭৪টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত সন্তোষজনক। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি প্রতিটি মণ্ডপে জেনারেটর ও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোও সার্বিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
WWW.DESHENEWS24.COM/REGISTRATION NO-52472/2024
Leave a Reply