
জসিম উদ্দীন ফারুকী বিশেষ প্রতিনিধিঃ
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক) আসনে বইছে তীব্র নির্বাচনী হাওয়া। শঙ্খ নদীর উভয় পাড়ের চন্দনাইশ-সাতকানিয়া (আংশিক) এলাকার মানুষের মুখে এখন কেবলই ভোটের হিসাব-নিকাশ।
দীর্ঘ সময় পর এই আসনে হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারে বিএনপি যেমন মরিয়া, তেমনি কর্নেল অলির উত্তরাধিকার রক্ষায় ছাতা প্রতীক নিয়ে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে এলডিপি।
অন্যদিকে ইসলামী ফ্রন্ট, জাতীয় পার্টি এবং বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পাওয়া দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীর উপস্থিতিতে নির্বাচনি সমীকরণ ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে।
চন্দনাইশের ২টি পৌরসভা, ৮টি ইউনিয়ন এবং সাতকানিয়ার আংশিক ৬টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনে এবার মোট ৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির জসিম উদ্দীন আহমেদ এবং ছাতা প্রতীকে এলডিপির অধ্যাপক ওমর ফারুক প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আলোচনায় থাকলেও পিছিয়ে নেই দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠ চষে বেড়ানো সাবেক বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট মিজানুল হক চৌধুরী (ফুটবল) ও শফিকুল ইসলাম রাহী (মোটরসাইকেল)।
এ ছাড়াও মাঠে রয়েছেন ইসলামী ফ্রন্টের মাওলানা সোলাইমান ফারুকী (মোমবাতি), জাতীয় পার্টির বাদশা মিয়া (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলনের মো. আবদুল হামিদ (হাতপাখা) এবং ইনসানিয়াত বিপ্লবের এইচ এম ইলিয়াছ (আপেল)।
এলডিপি-জামায়াতের নতুন মেরূকরণ
এই আসনের রাজনীতির বরপুত্র হিসেবে পরিচিত ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম এবার নিজে প্রার্থী না হয়ে ছেলে অধ্যাপক ওমর ফারুককে মাঠে নামিয়েছেন।
ইতোমধ্যে ১১-দলীয় জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জামায়াতে ইসলামীর প্রভাবশালী প্রার্থী ডা. শাহাদত হোসেন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে ওমর ফারুককে সমর্থন দেওয়ায় এলডিপি প্রার্থী সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। কর্নেল অলি নিজেও ছেলের পক্ষে নিরলস গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
বিভক্তিতে চ্যালেঞ্জে বিএনপি
একসময় বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে এবার ধানের শীষের প্রার্থী জসিম উদ্দীন আহমেদকে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। দলের একাংশের সমর্থন না পাওয়া এবং দুই প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় ভোটের মাঠে কিছুটা বেকায়দায় রয়েছে বিএনপি।
তবে প্রার্থী জসিম উদ্দীন আহমেদ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, নির্বাচিত হলে তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফা বাস্তবায়ন, পাহাড়ি এলাকায় সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি বন্ধ এবং এগ্রো ইকোনমিক জোন ও পর্যটন শিল্প বিকাশে কাজ করবেন।
বিদ্রোহীদের বক্তব্য
স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট মিজানুল হক চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিএনপির সূচনালগ্ন থেকেই তিনি দলকে সংগঠিত রেখেছেন। স্বৈরাচারী শাসনামলে নেতাকর্মীদের সুখে-দুঃখে পাশে থেকেছেন এবং আইনি সহায়তা দিয়েছেন।
আগে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করলেও এবার বিএনপির সঙ্গে কখনো সম্পৃক্ত না থাকা একজনকে মনোনয়ন দেওয়ায় তিনি সার্বজনীন নাগরিক পরিষদের ব্যানারে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।
অপর স্বতন্ত্র প্রার্থী শফিকুল ইসলাম রাহী বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের মূল্যায়ন না পাওয়ায় তিনি বাধ্য হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।
ভোটের হিসাব
নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ১৩ হাজার ৫১৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৬৫ হাজার ৮৪৭ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৪৭ হাজার ৬৬৫ জন। ১০০টি ভোটকেন্দ্রে ৫৯৯টি বুথে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৯৭৯ সালে বিএনপির ব্যারিস্টার মাহবুবুল কবিরের জয়ের মাধ্যমে এই আসনে বিএনপির যাত্রা শুরু হয়। এরপর ১৯৮১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় আসনটি কর্নেল অলি আহমদের দখলে ছিল।
২০০৬ সালে এলডিপি গঠনের পর বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোয় ভাঙন ধরে। ২০১৮ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে আসনটি হাতছাড়া হলেও এবার পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপি ও এলডিপি উভয়ই।
চন্দনাইশের সাধারণ ভোটারদের মতে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ফল নির্ভর করবে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, দলীয় ভোটব্যাংক এবং শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর।
WWW.DESHENEWS24.COM/REGISTRATION NO-52472/2024
Leave a Reply