কাইয়ুম চৌধুরী, সীতাকুণ্ডঃ
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড পৌরসভার মত জনবহুল ও স্পর্শকাতর ইকোপার্ক এলাকায় শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত বর্জ্য শোধনাগার করতে দেবেনা সীতাকুণ্ডবাসী, এমন চিন্তা করাও বোকামী, অযৌক্তিক বলে মত প্রকাশ করেছেন পরিবেশবাদীগন।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. ইদ্রিস আলি প্রতিনিধি কে বলেন, জনবসতি ও এশিয়ার বৃহত্তর সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক সংলগ্ন এলাকায় জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পের বিষাক্ত বর্জ্য শোধনাগার ( টিএসডিএফ) স্থাপনার কথা চিন্তা করা বোকামী ও অযৌক্তিক।পুরোনো জাহাজগুলোতে থাকে জৈব,অজৈব ও গ্যাসীয় বিষাক্ত বর্জ্য যেমন- অ্যাজবেস্টস, ভারি ধাতু, খনিজ তেল, জাহাজের তলা ও ব্যালাস্ট ওয়াটার, লুব্রিকেন্ট অয়েলসহ অসংখ্য ক্ষতিকর উপাদান। এছাড়া কারখানা বলতে পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদন,প্রাকৃতিক গ্যাস নিষ্কাশন, সীসা,দস্তা এবং তামার মত সংস্থান তৈরি,অ্যাসিড উৎপাদন, ধাতু প্রক্রিয়াকরণ,টেক্সটাইল উৎপাদন, চামড়ার টেনারি,ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনসহ বিস্তৃত শিল্পকে বুঝায়। টিএসডিএফ প্রকল্পে এ সকল শিল্পের বিষাক্ত বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত হবে,তাপ হবে,প্রতিক্রিয়া হবে কিন্তু পরিবেশ ও প্রাণীকূলের ক্ষতি হবে না এটা অবান্তর।
তিনি আরো বলেন, কিছু বর্জ্য ক্ষয়প্রাপ্ত হবে কিন্তু সব নয়।এটি গন্ধ নির্গত করে বিস্ফোরক মিথেন গ্যাস তৈরি করতে পারে যা প্রকৃতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
এছাড়া বর্জ্য ডিসপোজাল বা নিষ্পত্তি করার জন্য তৈরি ল্যান্ডফিল অবশ্যই মানুষের বসতি থেকে দূর হতে হবে। এটি পরিবেশের পাশাপাশি জীবের ক্ষতি করতে পারে।বর্জ্য নিষ্পত্তি বিপদজনক, রোগ ছড়ানোর এবং ভূগর্ভস্থ ও ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবস্থাকে দূষিত করার সম্ভাবনা রয়েছে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে আবাসন গুড়িয়ে ও কৃষিজমি ধ্বংস করে পুরোনো জাহাজ ভাঙ্গা এবং কল-কারখানার বিপদজনক বর্জ্য শোধনাগার টিএসডিএফ (ট্রিটমেন্ট স্টোরেজ ডিসপোজাল ফ্যাসিলিটি) প্রকল্প করার সমীক্ষা চলছে।সীতাকুণ্ড উপজেলার পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ডে অবস্থিত দেশের বৃহত্তম বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের পাদদেশে ঘনবসতিপূর্ণ মৌলভীপাড়া এলাকায় এ প্রকল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা ।ইতিমধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য শিল্প মন্ত্রণালয় ও জাইকার উদ্যোগে ওই এলাকায় সীমানা পিলার (খুঁটি) স্থাপন করা হয়েছে।ঝুঁকিপূর্ণ এ বর্জ্য শোধনাগার প্রকল্পকে এলাকার জনজীবন,জীববৈচিত্র্য ও পর্যটন শিল্পের জন্য মারাত্মক হুমকি বলছেন পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা।
সীতাকুণ্ড পৌরসভার প্রতি বর্গমাইলে এখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব ৫ হাজার ৬০০ জন।এখানকার পৌরসদরের কাছাকাছি এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স লাগোয়া গ্রাম মৌলভীপাড়া।এ গ্রামের পূর্ব উত্তর পাশে ঐতিহাসিক সনাতন ধর্মাবলম্বীদের চন্দ্রনাথ পাহাড় এবং পূর্ব দক্ষিণ পাশে দেশের বৃহত্তম বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক। স্থানীয় কয়েকশ পরিবারের আদি নিবাস কৃষি নির্ভর এ গ্রামে।জমির মূল্য অপেক্ষাকৃত কম হওয়ায় সীতাকুণ্ডে আসা নানান শ্রেণী পেশার মানুষ মৌলভীপাড়া সড়কের দুপাশকে স্থায়ী আবাসন হিসেবে গড়ে তোলে, পাশেই রয়েছে সরকারী প্রাইমারী স্কুল।
আবার চিহ্নিত এই টিএসডিএফ প্রকল্পের পাশে অবস্থিত ১ হাজার ৯৯৬ একরের বিশাল বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কে রয়েছে ৮২৪ প্রজাতির উদ্ভিদ, বৃক্ষরাজি, গুল্ম, ভেষজ ও লতা এবং ৩১০ প্রজাতির প্রাণী রয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ৩ লাখ পর্যটক এটি পরিদর্শন করে।এ পার্কের পথ ধরেই ১৫ লক্ষাধিক সনাতন তীর্থযাত্রী প্রতিবছর চন্দ্রনাথ ধাম দর্শন করে থাকেন। কিন্তু আচমকা বজ্রাঘাতের মত ইকোপার্ক লাগোয়া মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্তের স্বপ্নের আবাসন ও শত কৃষকের তিন ফষলি জমিতে পিলার গেড়ে বসে বর্জ্য শোধনাগার প্রকল্প।
বাংলাদেশ ২০২৩ সালের ১৪ জুন হংকং কনভেনশন অনুসমর্থন করার পর টিএসডিএফ প্রকল্পটি স্থাপন বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে। স্ক্র্যাপ জাহাজের নিরাপদ এবং পরিবেশসম্মত উপায়ে পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের উদ্দেশ্যে আইএমওর তত্ত্বাবধানে প্রণীত হয় হংকং কনভেনশন।২৬ জুন ২০২৫ থেকে এটি কার্যকর হবে।এ সময়ের মধ্যে টিএসডিএফ প্রকল্প বাস্তবায়িত না হলে শিপ রিসাইক্লিংয়ের জন্য নতুন করে কোনো জাহাজ ভাঙার অনুমোদন না দেয়ার বাধ্যবাধকতা আছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের। ইতিমধ্যে এ প্রকল্পে অর্থায়ন বিষয়ে নিশ্চিত করেছে জাপান ইন্টারন্যশনাল কো-অপারেশন্স এজেন্সি (জাইকা)।পরিবেশ রক্ষার টিএসডিএফ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যেন আরও বৃহৎ পরিসরে সীতাকুণ্ডের পরিবেশ ধ্বংসের পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে।
এদিকে এই প্রকল্প বাতিল করতে ইকোপার্ক পর্যটন রেঞ্জের বন কর্মকর্তা মোঃ আলাউদ্দীন, ও পূর্নাবাসন বন কর্মকর্তা মোঃ মাসুম কবির যৌথভাবে ইকোপার্ক পরিচালক মোঃ হুসাইনকে চিঠি দেন বলে প্রতিনিধি কে জানান,চিঠিতে ইকোপার্কের ক্ষতির সম্ভাবনা তুলে ধরেন,তিনি সেই চিঠি পেয়ে বন ও পরিবেশ মন্ত্রনালয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে কি কি ক্ষতি হবে তুলে ধরেন এবং বর্জ্য ধ্বংস প্রকল্প অনত্র করার সুপারিশ করেন।
জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পের বর্জ্য শোধনাগার ইকোপার্ক এলাকা গড়ে তোলা নিয়ে সীতাকুন্ড সমাজ কল্যান ফেডারেশনের সভাপতি গিয়াস উদ্দীন প্রতিনিধি কে বলেন,পৌর এলাকায় শত শত বাসিন্দা এ ইকোপার্কের মাঝে জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পে বর্জ্য শোধনাগার হতে পারেনা,আমরা হতে দেবোনা,এই প্রকল্প মানুষের জন্য,ক্ষতি হবে এমন প্রকল্প আমরা চাইনা।
সীতাকুণ্ড ইউএনও কেএম রফিকুল ইসলাম প্রতিনিধি কে বলেন,প্রকল্পটি বিদেশী আর্থায়নে নির্মিত হচ্ছে,তারা এই স্থানটি পছন্দ করেছে,সবদিক বিবেচনা করেই স্হাপন করা হবে।
স্হানীয় সংসদ সদস্য এসএম আল মামুন প্রতিনিধি কে বলেন,পরিবেশ রক্ষা করতেই এই প্রকল্প স্হাপন করা হবে যদি পরিবেশ ও মানুষের ক্ষতি হয় তাহলে কিভাবে হবে,এই প্রকল্প ইকোপার্ক সংলগ্নে নয় বরং সাগরপাড়ের কাছেই ভাল মনে করি।