
বিশেষ প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কুমিরা রেলস্টেশনসংলগ্ন স্টাফ কলোনির পরিত্যক্ত জায়গায় দীর্ঘ ৩০-৪০ বছর ধরে বসবাসরত প্রায় ২০০ ভূমিহীন পরিবারের ঘরবাড়ি ভেঙে রেলওয়ের জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে ‘কেওয়াইসিআর কয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’-এর বিরুদ্ধে।
ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত চার দিন ধরে যুবদলের সাবেক এক নেতার নেতৃত্বে বহিরাগত শতাধিক ব্যক্তি ও একাধিক এক্সকাভেটর দিয়ে তাঁদের বসতঘর ভেঙে ফেলা হচ্ছে। এতে বসতভিটা হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন নারী-পুরুষ ও শিশুরা। তাঁদের প্রশ্ন—দীর্ঘদিনের বসতভিটা হারিয়ে তাঁরা এখন কোথায় যাবেন, কীভাবে পরিবার নিয়ে বাঁচবেন?
গতকাল সরেজমিনে উপজেলার সোনাইছড়ি ইউনিয়নের কুমিরা রেলস্টেশন কলোনিতে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নাকাটি করছেন কয়েকজন নারী ও পুরুষ। কেউবা নিজেদের শেষ আশ্রয়টুকু হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। বাসিন্দাদের দাবি, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো প্রকার অফিসিয়াল বা আনুষ্ঠানিক উচ্ছেদ কার্যক্রম ছাড়াই বহিরাগত লোকজন এনে তাঁদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে।
৬০ বছর বয়সী মজিদ উদ্দিনসহ স্থানীয় অধিবাসীরা জানান, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনে বসতভিটা হারানোর পর তাঁরা কুমিরা রেলস্টেশন কলোনিতে বসবাস শুরু করেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনুশাসনে তাঁরা এখানে আশ্রয় পেয়েছিলেন। এরপর গত তিন থেকে চার দশক ধরে পরিবার-পরিজন নিয়ে সেখানেই বসবাস করে আসছেন। কিন্তু এখন বিকল্প কোনো অবাসনের ব্যবস্থা না করেই তাঁদের জোরপূর্বক তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, স্থানীয় এক বিএনপি নেতার বাড়িতে ডেকে নিয়ে কোনো পরিবারকে এক লাখ, কাউকে দেড় লাখ, আবার কাউকে মাত্র ৪০ হাজার টাকা দিয়ে বিদায় করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু কেওয়াইসিআর ইন্ডাস্ট্রিজ কর্তৃপক্ষের প্রতি পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। এমনকি ফাঁকা বা অসম্পূর্ণ স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হলেও সেখানে ক্ষতিপূরণের টাকার পরিমাণ উল্লেখ করা হচ্ছে না। এছাড়া ক্ষতিপূরণের টাকার জন্য বেশি চাপ দিলে দাঙ্গা পুলিশের ভয় দেখানো হচ্ছে বলেও বাসিন্দারা অভিযোগ করেন।
স্থানীয়রা জানান, কেওয়াইসিআর কয়েল ইন্ডাস্ট্রিজের কাছে রেলওয়ের এ বিশাল জমি লিজ দেওয়ার পর থেকেই মূলত তাঁদের উচ্ছেদের চক্রান্ত শুরু হয়। প্রায় এক মাস আগে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ উচ্ছেদে গেলে স্থানীয়দের বাধার মুখে এক মাসের সময় দিয়ে ফিরে যায়। সর্বশেষ গত ২০ অক্টোবর উচ্ছেদের কথা থাকলেও সেদিন রেলওয়ের কোনো কর্মকর্তা আসেননি। কিন্তু এর পরপরই বহিরাগত ক্যাডার বাহিনী দিয়ে ঘরবাড়ি ভাঙার তাণ্ডব শুরু হয়।
এর আগে গত ১২ অক্টোবর কুমিরা রেলস্টেশন কলোনিতে কেওয়াইসিআর কয়েল ইন্ডাস্ট্রিজের জমি অধিগ্রহণ ও উচ্ছেদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান উপজেলা জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত খালেদা বেগম, সেলী রানী দাস, পরিমল দাস, জ্যোৎস্না বেগম, মনির, নুরজাহান ও শামসুল আলমসহ অনেকে তাঁদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন।
অভিযোগের বিষয়ে কেওয়াইসিআর কয়েল ইন্ডাস্ট্রিজের দায়িত্বপ্রাপ্ত এইচ আর কর্মকর্তা মো. ইমরানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মিটিংয়ে আছেন জানিয়ে ফোন কেটে দেন। অন্যদিকে, বিভাগীয় রেলওয়ের ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা মো. খোরশেদ আলম চৌধুরীর ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
গৃহহীন হয়ে পড়া পরিবারগুলোর দাবি—আইনগত প্রক্রিয়া, ক্ষতিপূরণের স্পষ্ট শর্ত ও অর্থ প্রদানের হিসাব স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে। বিকল্প আশ্রয়ের ব্যবস্থা না করে তাঁদের যেন ভিটেমাটিছাড়া করা না হয়। এ বিষয়ে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।