জসিম উদ্দীন ফারুকী, বিশেষ প্রতিনিধিঃ
চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গাছবাড়িয়া নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। ১৯১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত শতবর্ষী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি একসময় পুরো অঞ্চলের শিক্ষার গর্ব হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে শিক্ষক স্বল্পতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি সচেতন অভিভাবকদের আস্থার জায়গা হারাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত শিক্ষকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। দীর্ঘদিন ধরে অধিকাংশ শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় নিয়মিত পাঠদান প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ বা বদলি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই শূন্যতা পূরণ না করা হলে এলাকার মাধ্যমিক শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জানা গেছে, সরকারিকরণের আট বছরের মধ্যেই ভয়াবহ শিক্ষক সংকটে পড়েছে বিদ্যালয়টি। যেখানে একসময় ২৫ থেকে ৩০ জন শিক্ষক পাঠদান করতেন, বর্তমানে এক শিফটে সাধারণ শাখায় স্থায়ী শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ছয়জন।
ইংরেজি, বাংলা, গণিত, বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষাসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষক শূন্যতা রয়েছে। পাশাপাশি ২০২৫ সাল থেকে প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রমও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
জাতীয়করণের আগে বিদ্যালয়টিতে ১৩ জন এমপিওভুক্ত শিক্ষক থাকলেও অবসরের পর শূন্য পদে নতুন নিয়োগ হয়নি। ফলে নিয়মিত পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৬৩০ জন। সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ শিক্ষক আছেন মাত্র ছয়জন। এর মধ্যে একজন শিক্ষক তিন মাস পর অবসরে যাবেন। সে হিসেবে গড়ে ১০৫ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন সরকারি শিক্ষক রয়েছেন। অথচ জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী গড়ে ৩০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক থাকার কথা। এ অবস্থায় বিদ্যালয়টি কীভাবে চলছে এবং ভবিষ্যতে কীভাবে চলবে—সেই প্রশ্নের উত্তর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কাছেও স্পষ্ট নয়।
বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক রনজিৎ কুমার দে ও শিক্ষক বিজন চক্রবর্তী বলেন, সরকারি এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান, বাংলা ও ইংরেজিসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষক নেই।
তারা জানান, সাতজন কর্মচারীর অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে আছেন মাত্র একজন অফিস সহকারী (তৃতীয় শ্রেণি)। চলতি বছর নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন শুরু হলেও শিক্ষক সংকটের কারণে শিক্ষা কার্যক্রম প্রায় থমকে গেছে।
সংকট সামাল দিতে দীর্ঘদিন ধরে অল্প সম্মানীতে আটজন খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে কোনোমতে পাঠদান চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বেতনে পাঁচজন কর্মচারী দিয়ে দৈনন্দিন কাজকর্ম পরিচালনা করা হচ্ছে।
বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকসহ সব শূন্য পদ পূরণ করে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকরা।
এসএসসি পরীক্ষার্থী মানিক বলেন, ‘শিক্ষক সংকটের কারণে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক সময় এক বিষয়ের ক্লাস অন্য বিষয়ের শিক্ষক নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে শিক্ষার মান কমে যাচ্ছে। আমরা নিয়মিত ও উপযুক্ত বিষয়ে দক্ষ শিক্ষক চাই, যাতে ভবিষ্যৎ গড়ার পথে কোনো বাধা না আসে।’
একাধিক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে জানায়, নিয়মিত ক্লাস না হওয়ায় সিলেবাস শেষ করা নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় রয়েছে। অনেক বিষয়ের মৌলিক পাঠ তারা শ্রেণিকক্ষে পাচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে অনেককে চড়া মূল্যে প্রাইভেট বা কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
অভিভাবকদের মতে, প্রতিষ্ঠানটি সরকারি হওয়ার পর থেকে মানসম্মত শিক্ষার আশা থাকলেও শিক্ষক সংকটের কারণে তা পূরণ হচ্ছে না।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ মতিন শিক্ষক সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা ও শিক্ষক স্বল্পতার মধ্যেই বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। অতি কষ্টে কোনোমতে ক্লাস পরিচালনা করছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বহুবার জানানো হলেও প্রয়োজনীয় শিক্ষক পাওয়া যায়নি। এক বিষয়ের শিক্ষককে অন্য বিষয়ের ক্লাস নিতে হচ্ছে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা মাধ্যমিক একাডেমিক সুপারভাইজার বিপিন চন্দ্র রায় বলেন, ‘বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।’
চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাজিব হোসেন বলেন, ‘বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকটের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসক ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকেও জানানো হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে।’