কাইয়ুম চৌধুরী,সীতাকুণ্ডঃ
চট্টগ্রাম–৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা লায়ন আসলাম চৌধুরীকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে যে ঋণ–সম্পদ সংক্রান্ত আলোচনা ও সমালোচনা চলছে, তার বড় একটি অংশ তথ্যের খণ্ডিত উপস্থাপন এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উপেক্ষার ফল বলে মন্তব্য করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক,কলামিস্ট মোঃ হাফিজ আল আসাদ।
তিনি বলেন,মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দাখিল করা হলফনামার তথ্যকে ভিত্তি করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, তার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪৫৭ কোটি টাকা হলেও মোট ঋণের অঙ্ক প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা—যা প্রথম দৃষ্টিতে অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হতে পারে। কিন্তু এই সংখ্যাগুলো কীভাবে তৈরি হয়েছে এবং এর পেছনের বাস্তবতা কী—তা না বুঝলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বিভ্রান্তিকর হয়ে ওঠে।
হলফনামা অনুযায়ী, উল্লিখিত ঋণের একটি বড় অংশই ব্যক্তিগত ঋণ নয়; বরং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জামিনদার ও পরিচালক (ডিরেক্টর) থাকার সুবাদে সৃষ্ট দায়। পাঁচটি ব্যাংকে সরাসরি ঋণের অঙ্ক প্রায় ৩৫৪ কোটি টাকা, বাকিটা বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ঋণে জামিনদার বা পরিচালকের দায় হিসেবে যুক্ত। ব্যবসায়িক বাস্তবতায়, বিশেষ করে শিল্প ও স্টিল খাতের মতো পুঁজি–নির্ভর খাতে, এ ধরনের দায় থাকা অস্বাভাবিক নয় এবং আইনগতভাবে এটিকে ব্যক্তিগত সম্পদের সমতুল্য ধরা যায় না। ঋণ কোনো সম্পদ নয়; এর মালিকানা দাবি করা যায় না—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সত্য।
আসলাম চৌধুরীর আর্থিক পরিস্থিতির পেছনে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হলো তার দীর্ঘ কারাবন্দি জীবন। ফ্যাসিবাদী সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে তিনি প্রায় ৯ বছর (৮ বছর ৩ মাস) কারাগারে ছিলেন। এই সময়ে তার প্রায় ৪১টি শিল্প–কারখানা কার্যত ধ্বংস হয়ে যায়; ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে লুটপাট ও দখলদারিত্বের ঘটনাও ঘটেছে। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকায় ব্যবসা দেখভালের মতো কেউ ছিলেন না—গ্রেপ্তারের সময় তার একমাত্র কন্যা ছিলেন স্কুলপড়ুয়া, আর পরিবারের অন্য সদস্যরাও নানা নিপীড়নের শিকার হন। স্বাভাবিকভাবেই, বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যবসা ও দীর্ঘ স্থবিরতার কারণে ঋণ পুনঃতফসিল না হওয়া, সুদের বোঝা বেড়ে যাওয়া এবং খেলাপি অবস্থার সৃষ্টি হয়—যার ফলে মোট দায়ের অঙ্ক বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
এখানে উল্লেখযোগ্য যে, বিএনপি প্রথম দফায় তাকে মনোনয়ন দেয়নি, খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত জটিলতার কারণেই। পরবর্তীতে ব্যাংকিং চ্যানেলের সঙ্গে সমঝোতা, আইনি প্রক্রিয়া ও পুনর্গঠনের অগ্রগতির পরই দল থেকে পুনরায় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে—যা ইঙ্গিত করে যে বিষয়টি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিকভাবে “গ্রিন সিগনাল” ছাড়া এগোয়নি। অর্থাৎ, এটি কোনো নিয়মবহির্ভূত সুবিধা নয়; বরং প্রচলিত ব্যাংকিং ও আইনি কাঠামোর মধ্যেই নিষ্পত্তিযোগ্য একটি প্রক্রিয়া।
সমালোচনার আরেকটি দিক হলো, তার বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা। হলফনামায় উল্লেখিত ১৩২টি মামলার বড় অংশই রাজনৈতিক ও এনআই অ্যাক্ট–সংক্রান্ত; এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলা ইতোমধ্যে খালাস হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকা নতুন কিছু নয়—এটি অনেক সময় রাজনৈতিক চাপ ও দমননীতিরই বহিঃপ্রকাশ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিছু গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলের পক্ষ থেকে এই তথ্যগুলোকে একপাক্ষিক ও নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা। ঋণকে সম্পদের সমতুল্য দেখানো, জামিনদারি দায়কে ব্যক্তিগত ভোগ–বিলাসের ইঙ্গিত হিসেবে তুলে ধরা, কিংবা দীর্ঘ কারাবন্দির প্রেক্ষাপট আড়াল করা—এসবই জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করে। বিশেষ করে “আমার দেশ”,ও খোলা কাগজ এ প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভাষা ও উপস্থাপনাকে তার পক্ষ থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, আসলাম চৌধুরীর বর্তমান আর্থিক চিত্রকে বিচ্ছিন্ন সংখ্যার খেরোখাতা দিয়ে বিচার করলে বাস্তবতা ধরা পড়ে না। তিনি একজন শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী—এই শ্রেণির মানুষের ক্ষেত্রে ঋণ থাকা স্বাভাবিক; প্রশ্ন হলো ঋণ কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে এবং তা কীভাবে নিষ্পত্তি হচ্ছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক নিপীড়ন, কারাবন্দি অবস্থায় ব্যবসা ধ্বংস, এবং পরবর্তীতে আইনগত ও ব্যাংকিং প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা—এই পূর্ণ প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে স্পষ্ট হয়, এটি কোনো অবৈধ সম্পদ সঞ্চয়ের গল্প নয়; বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মধ্য দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত একজন শিল্পোদ্যোক্তার বাস্তবতা।
সংবাদটির বিস্তারিত যুক্তি,তথ্য প্রদান করেন,রাজনৈতিক বিশ্লেষণ,ও কলাম লেখক মো: হাফিজ আল আসাদ।